শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১২

বাল্যবিবাহ ও আমাদের সচেতন সমাজ



গত ৬ই সেপ্টেম্বর ২০১২, জমিদারী ভাব নিয়ে ঘুম থেকে উঠলাম সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে। ফ্রেশ হয়ে মনে হল নাস্তাটা আজকে বাইরে করলে কেমন হয়??জমিদারী ভাব যাকে বলে আর কি। মাকে অনেক কষ্টে বুঝিয়ে রাজি করালাম এবং অনুমতিও পেলাম বাইরে নাস্তা করার জন্য যদিও ঝাড়ির মাত্রাটা কম ছিলনাচৌরঙ্গী পৌঁছেই হেলাল মামার হোটেলের ছোলা আর মুড়ির লোভ সামলাতে পারলাম না। যেই ভাবা সেই কাজ, সোজা চলে গেলাম হোটেলের পূর্ব পাশে প্রাকৃতিক পরিবেশের কোল বিশিষ্ট এক টেবিলে। প্রাকৃতিক কোল বিশিষ্ট টেবিল বললাম এ কারণেই হোটেলটি বাজারের একেবারে পূর্ব পাশের শেষ প্রান্তে একটি পুকুর পাড়ে এবং পূর্ব পাশটা অনেকটাই খোলামেলা বলে গরমের দিন এখানে হালকা বাতাসে বেশ ভালই লাগে। ছোলা মুড়ির অর্ডার দিলাম। টেবিলে তখন আমি একাই, তখনও ফ্রেন্ড সার্কেলের কেউ আসেনি। উল্লেখ্য বাড়িতে থাকলে আড্ডাটা বন্ধুদের নিয়ে সকাল-বিকাল দুই বেলায় হয়। একটি থালাতে ছোলা মুড়ি ও সাথে একটি চামচ টেবিলে হাজির হলে আমি চামচ দিয়ে নেড়ে খাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিই। এমন সময় এলাকার কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যাক্তি হোটেলে উপস্থিত হয়। এবং তারা আমার এক টেবিল পরে পাশের টেবিলে বসে। তাদের মধ্যে একজন সাবেক ইউপিঁ সদস্য,একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক,একজন ধনাঢ্য চাল ব্যাবসায়ী,একজন সাবেক মহিলা ইউপি সদস্যের স্বামী এবং একজন মাংস ব্যাবসায়ী।  উল্লেখ্য সেদিন ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে ছবিসহ ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ চলছিল। কয়েক চামচ মুখে দিয়েই তাদের দিকে তাকিয়ে দেখি তাদের খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে এবং তারা কোন এক বিষয় নিয়ে আলাপচারিতা শুরু করল। কথাগুলো কানে আসতেই আমি থমকে যাই। তাদের মাঝে আলাপচারিতার বিষয়টা ছিল এরকম, মাংস ব্যাবসায়ীর এক মেয়ের বয়স বার(১২) বছর। বিয়ের জন্য একটা নাকি ভাল প্রস্তাব এসেছে কিন্তু বাঁধ সেজেছে অন্য জায়গায়,জন্মসনদ করিয়েছেন কিন্তু মেয়ের বয়স ১৮ পূর্ণ না হওয়ায় জাতীয় পরিচয় পত্রের জন্য মেয়েটাকে কর্তৃপক্ষ ছবি তোলার এবং ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির অনুমতি দেয়নি। এবং বর্তমান আইন অনুযায়ী জাতীয় পরিচয় পত্র ছাড়া কোন কাজীই বিয়ে রেজিষ্ট্রি করতে রাজি হবেন না। কাহিনী এখানেই শেষ নয়, নতুনভাবে বয়স বাড়িয়ে জন্মসনদ নিবন্ধনের জন্য তারা সবাই ইউপি চেয়ারম্যানের কাছে দেন দরবার করেন কিন্তু ইউপি চেয়ারম্যান তাতে অস্বীকৃতি জানায়এ জন্য তারা সবাই সেখানে ইউপি চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে উনাকে তুলোধুনো করেন এবং ইউপি চেয়ারম্যানের ক্ষমতাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখান। আলাপচারিতার এক পর্যায়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মেয়ের বাবাকে উপদেশ দিলেন কোন উকিলের কাছে গিয়ে নতুনভাবে নাম এবং বয়স এফিডেফিট করিয়ে নেওয়ার জন্য। আমি মনে মনে রাগে ফুঁসছিলাম এবং ভাবতে অবাক লাগছিল আজ যারা সমাজের অসংগতিগুলোকে দূর করবে আজ তারাই কিনা এসব অসঙ্গতিকে প্রশয় দিচ্ছে এবং সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে অবক্ষয়ের দিকে!!! আমি কিছু বলার জন্য সুযোগ খুজছিলাম কিন্তু আবার ইতস্তত বোধ করছিলাম বলব কিনা, কারণ এর আগে এরকমক কিছু সামাজিক অসংগতির প্রতিবাদ করাতে অনেক গণ্যমান্য ব্যাক্তি ও এলাকার কিছু বড় ভাইয়ের কাছে আমি ‘বেয়াদব দ্যা গ্রেট’ উপাধি পেয়েছি!!! কিন্তু একবার সুযোগ নিয়ে মেয়ের বাবাকে বললাম,’ভাই মেয়েটাকে ১৮ বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে না দিলে হয়না???’ উত্তরে মেয়ের বাবা আমাকে বলল,’ভাই মাথার উপর বোঝা যতই থাকবে মাথার ব্যাথা ততই বারবে’। আমার আর কিছু বলার থাকলনা এবং বলার সু্যোগও দিল না। তারা চলে যাওয়ার পর অনেক্ষন আমি একা একা বসে ভাবলাম এই আমাদের সচেতন সমাজ যারা বাল্যবিবাহের মত ভয়ংকর একটা অসংগতিকে আরো বেগবান করছে, সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে এক গভীর অন্ধকারে বাহবা জানাই এই সচেতন সমাজকে!!!

তাং:  ০৯-০৯-১২

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন