বুধবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১২

সড়ক দূর্ঘটনা: ‘দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা’



স্বাভাবিকতার বেড়াজাল থেকে পৃথিবীর কোন প্রাণীই এর অন্তরালে নয়। প্রত্যেক ধর্মের মত অনুসারে মহান সৃষ্টিকর্তার হাতেই থাকে প্রতিটি প্রাণীর জীবন ঘুড়ির নাটাই। আকাশে বাতাস হ্রাস পাওয়ার সাথে সাথেই ঘুড়ি একসময় ভূ-পৃষ্ঠে ধাবিত হয়, এটা স্বাভাবিক নিয়ম, কিন্তু আকাশে ভরপুর বাতাস থাকা সত্যেও ভূ-পৃষ্ঠে ঘুড়ি ধাবিত হওয়াটাকে আমরা কখনই স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে পারবনা। আমাদের সবার জীবন ঘুড়িও একদিন ভূ-পাতিত হবে এটা মেনেই আমরা পৃথিবীতে এসেছি। কিন্তু  আমাদের কাছের কোন প্রিয় মানুষের অকালে চলে যাওয়াটাকে কখনই সহজভাবে মেনে নিতে পারবনা। মেনে নিতে পারিনি আমিও। কারণ ২০০৫ সালের ২৬ শে মে যেদিন আমার বড় বোন সড়ক দূর্ঘটনায় পরলোক গমন করেন সেদিন দেখেছি, সড়ক দুর্ঘটনায় শুধু একজনের চলে যাওয়া নয়, একটি পরিবারের সারা জীবনের কান্না। কারণ ঠিক তখনই  আপুর জীবনের পথ চলা শুরু হয়েছিল। ২০০৪ সালে সিরাজগঞ্জ ম্যাটস থেকে তিন বছরের মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং শেষ করে মানব সেবার ব্রত নিয়ে যোগদান করেন সাজেদা ফাউন্ডেশনের স্বাস্থ্য প্রোগামে। আপুর মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ২০ বছর। কিন্তু  সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে তিনি আরেকটি নতুন জীবন শুরুর উদ্দেশ্য নিয়ে বাড়িতে ফিরছিলেন। আপুর বিয়ের পিড়িতে বসার সব দিন-ক্ষণ ঠিক হয়েছিল, কিন্তু ভাগ্য আর সহায় হল না, ফেরা হল না নতুন জীবনের উদ্দেশ্য পুরনে। ঢাকা থেকে ফেরার পথে রংপুরের পীরগঞ্জে এক মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় আপু ইন্তেকাল করেন। স্বপ্ন ভঙ্গ হল একটি পরিবারেরও। সেদিন মনে হয়েছিল পরিবারের অঙ্গ থেকে ভেঙ্গে গেল একটি গুরুত্বপুর্ণ হাড়। সেই দুঃসহ স্মৃতি আজও ভুলতে পারিনি আমাদের পরিবারের কেওই। কিন্তু এমন ছিল না যে তিনিই আমাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যাক্তি। কারণ আমাদের পরিবারের সবাই প্রতিষ্ঠিত এবং উপার্জনক্ষম। আমি কৃতজ্ঞিত আমার মাধ্যমিক পর্যায়ের সকল স্কুল বন্ধুদের প্রতি, যারা সেদিনের দুঃর্বিসহ দিনগুলোতে আমাকে সান্তনা দিয়েছিল এবং মানসিক ভাবে স্বাভাবিক হওয়ার জন্য আমাকে মানসিক ভাবে সাহায্য করেছিল। অনেকটি বছর পেরিয়ে গেলেও সেই স্মৃতি ভুলে যাওয়া সম্ভব হয়নি। চেষ্টা করেছি এবং যোগ দিয়েছি  সড়ক দূর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন সভা,সেমিনার এবং মানব বন্ধনে। এতো গেল আমার ব্যাক্তিগত এবং একটি পরিবারের কথা। বাংলাদেশের হাজার হাজার পরিবার আজ সড়ক দূর্ঘটনা নামের ব্যাধিতে আক্রান্ত, কেউ হারিয়েছেন বাবা,কেউ হারিয়েছেন মা, কেউ হারিয়েছেন ভাই বা বোন আবার কেউ হারিয়েছেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যাক্তিকে। আমরা যখন এই ব্যাধির বিরুদ্ধে সবাই সোচ্ছার হয়ে আন্দোলন করছি ঠিক তখনই আমাদের সরকারের উচ্চপর্যায়ের একজন নেতা এবং সরকার দলীয় সাধারন সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এক বিবৃতিতে বললেন,"সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলে আন্দোলন করার কিছু নেই, অ্যাকসিডেন্ট ইজ অ্যাকসিডেন্ট"!!!! এটা অবশ্যই সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যাওয়া আত্মাদের প্রতি এবং নিহতদের স্বজনদেরর প্রতি 'নিষ্ঠু্র' এবং 'নির্মম পরিহাস'। 
সড়ক দুর্ঘটনায় প্রণহানির সংখ্যা দিন দিন ভয়াবহ আকারে বেড়েই চলেছে। প্রতিদিনই এ যন্ত্রদানবের দুর্ঘটনার শিকার হয়ে দেশের বহু জ্ঞানী, গুনী, বুদ্ধিজীবি, চলচিত্র নির্মাতা, নিষ্পাপ শিশু থেকে বৃদ্ধ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ অনেকেই অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন। দুর্বল আইন ও সরকারের উপযুক্ত মনিটরিং অভাবের সুযোগ নিয়ে চালক নামের ঘাতকেরা রীতিমত হত্যার লাইসেন্স পেয়েছে এমন অবস্থাই যেন এখন নিত্য দিনের চিত্র। অদক্ষ ও আনাড়ি চালকের বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, মালিকের স্বেচ্ছাচারিতা, খামখেয়ালীপানা, জনসচেতনতার অভাব, দায়ী চালকের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তির বিধান না থাকা, চালকের মোবাইল ফোনে কথা বলা- এসব কারণেই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ মহল।
সড়ক দুর্ঘটনা যেমন একদিকে কেড়ে নিচ্ছে বহু জ্ঞানী-গুনী, বুদ্ধিজীবির প্রাণ তেমনি অন্যদিকে দেশ হারাচ্ছে তার সোনার সন্তান।
মাননীয় মন্ত্রী ভুলে গেছেন মিরসরাই ট্রাজেডি, যেখানে অকালে প্রাণ হারায় ৫৩ জন শিশু শিক্ষার্থী, ভুলে গেছেন মানিকগঞ্জ রোডে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রক্ষ্যাত চলচিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক মিশুক মনির নিহত হওয়ার কথা। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রণহানির সংখ্যা দিন দিন ভয়াবহ আকারে বেড়েই চলেছে। দুর্বল আইন, উপযুক্ত মনিটরিং ও সরকারের দ্বায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর কর্তব্যে অবহেলার সুযোগে চালকেরা রীতিমত বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। শুধুমাত্র সরকারি হিসাব অনুযায়ী গত ১৭ বছরে সাড়ে ৭০ হাজার সড়ক দুর্ঘটনায় অর্ধলক্ষাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। আহতের সংখ্যা আরো বেশি।
নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থার ব্যাপারে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন জানান, দূর্ঘটনার জন্য চালকদের শাস্তি না হওয়ায় তারা অত্যন্ত বেপোরোয়া হয়ে গাড়ি চালায়। এজন্য দরকার যুগোপযোগী আইন। শুধু আইন করলেই চলবে না আইনের বাস্তবায়নও করতে হবে। এ কারনে জাতীয় ঐক্যমতের ভিত্তিতে নিরাপদ সড়ক ব্যাবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ড্রাইভাররা মনে করেন দূর্ঘটনা না ঘটলে হাত পাকা হয় না। চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান ও পাঠ্যপুস্তকে ড্রাইভিং বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে নিজস্ব অর্থায়নে কাজ করে আসছি। কোন সময়ই সংশ্লিষ্ঠ কোন ব্যক্তিবর্গের সাহায্য পাইনি।
এর পরেও রয়েছে সড়ক ব্যাবস্থাপনা এবং মনিটরিংয়ে দুর্নীতি। সড়ক ব্যাবস্থাপনার বেহাল দশা সম্পর্কে বলার আর কিছুই নেই, কারণ যোগাযগ ব্যাবস্থার সাম্প্রতিক দুর্নীতি সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত। অধিকাংশ সড়কে ডিরেকশন ইন্ডিকেটর এর বদলে দেখতে পাই বিভিন্ন কোম্পানির বিজ্ঞাপন, যার অর্ধেক টাকাও আবার যায় সংশ্লিষ্ট বিভাগের দুর্নীতিবাজদের পকেটে।
বিআরটিএ-এর এক সূত্র থেকে জানা যায়, কো-অর্ডিনেশন এন্ড মনিটরিং অফ ন্যাশনাল রোড সেফটি স্ট্রাটেজি এ্যাকশন প্লেন ২০০২-০৪ শুধু মাত্র যথাযথ অর্থায়নের অভাবে বাদ পড়ে। বিআরটিএ আরো জানায়, ১৯৯৫ সালের জুলাইয়ে ন্যাশনাল রোড সেফটি কাউন্সিল গঠন করা হলেও এই কাউন্সিলের গৃহীত সুপারিশ মালা এখন পর্যন্ত ৩০ শতাংশও কার্যকর হয়নি। দেশে প্রতি বছর সড়ক উন্নয়নের ক্ষাতে ১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হলেও সড়কের নিরাপত্ত্বার জন্য কোন বরাদ্দ দেয়া হয়নি।
আসুন দেখি বিগত কয়েকটি বছরের সড়ক দূর্ঘনার ভয়াবহ পরিসংখ্যান:-
সাল______নিহত______আহত/পঙ্গু
১৯৯৪_____৩০১৩_____২৭৩৫ জন
১৯৯৫_____১৬৫৩_____২৮৬৪ "
১৯৯৬_____২০৪১_____৪০৭৬ "
১৯৯৭_____৩১৬২_____৩৯৯৭ "
১৯৯৮_____৩০৮৫_____৩৪৫৩ "
১৯৯৯_____৩৩১৪_____১৯১১ "
২০০০_____৩৪৩০_____৩১৭২ "
২০০১_____৩১০৯_____৩৬০৭ "
২০০২_____৩৩৯৮_____৩০৭০ "
২০০৩_____৩৩৮৯_____৩৮১৮ "
২০০৪_____২৯৬৮_____২৭৫২ "
২০০৫_____৩১৮৭_____৩৭৫৫ "
২০০৬_____৩১৯৩_____২৪০৯ "
২০০৭_____৩৭৪৯_____৩২৭৩ "
২০০৮_____৩৭৬৫_____৩২৮৪ "
২০০৯_____২৯৫৮_____২৬৮৬ "
২০১০_____৩১৯৫_____২৫৫৭ "
২০১১_____৩৭৯৫_____২৪৯৫"
এবার চলুন দেখি সড়ক দুর্ঘটনার কিছু কারণঃ-
* অদক্ষ চালক
* ট্রাফিক আইন না মানা
* দূর্বল ট্রাফিক আইন
*সড়কের বেহাল অবস্থা
* ঘুষের মাধ্যমে ড্রাইভিং লাইসেন্স লাভ
* পর্যাপ্ত ট্রাফিক পুলিশের/সাইনের অভাব
* অপরিকল্পিত/ভাঙ্গা/অপ্রশস্ত রাস্তাঘাট/টার্নিং
* অমনযোগী/মদ্যপ/তন্দ্রাযুক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো
* হেল্পার দিয়ে গাড়ি চালানো
* গাড়ি চালানো অবস্থায় ফোনে কথা বলা
* ওভারটেকিং/ ওভার স্পিড/ প্রতিযোগীতা
* অসেচতন যাত্রী
* যেখানে-সেখানে রাস্তা পারাপার
* পর্যাপ্ত ওভারব্রিজের অভাব
* ত্রুটিপূর্ণ যানববাহন/যানববাহনের প্রচুরতা
* ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী পরিবহণ
আমরা কি পারব আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটা নিরাপদ সড়ক ব্যাবস্থাপনা রেখে যেতে??? আমাদের মন্ত্রী-আমলাদের কি সুহৃদয় বা সুদৃষ্টি হবে এই বিষয়ে নজর দিতে??? না আবার আমাদেরও সড়ক দুর্ঘটনায় জীবন দিয়ে 'নির্মম পরিহাসের' বিষয়-বস্তু হতে হবে মন্ত্রী-আমলাদের বিবৃতি দেওয়ার জন্য???

১১-১০-২০১১

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন