শনিবার, ২৭ মার্চ, ২০২১

রাজা টংকনাথের রাজবাড়ি

 

রাজা টংকনাথের রাজবাড়ি 

রাজা টংকনাথ চৌধুরী,  ইংরেজ শাসনামলে বর্তমান বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীশংকৈল উপজেলায় অবস্থিত মালদুয়ার পরগণার একজন জমিদার ছিলেন। রাজা টংকনাথ এর পূর্ব-পুরুষদের কেউ জমিদার ছিলেন না । বর্তমানে রাণীশংকৈল উপজেলা সদর হতে ৭ কিলোমিটার  পূর্বে কাতিহার নামক জায়গায় গোয়ালা বংশীয় নিঃসন্তান এক জমিদার  বাস করতেন । সেই জমিদারের মন্দিরে সেবায়েত হিসাবে কাজ করতেন টংকনাথের পিতা বুদ্ধিনাথ গোয়ালা জমিদার ভারত এর কাশি যাওয়ার সময় তাম্রপাতে দলিল করে যান যে, তিনি ফিরে না এলে মন্দিরের সেবায়েত বুদ্ধিনাথ জমিদারির মালিক হবেন । গোয়ালা জমিদার ফিরে না আসায় বুদ্ধিনাথ জমিদারির মালিক হন । তবে অনেকে মনে করেন এই ঘটনা বুদ্ধিনাথের দু-এক পুরুষ পূর্বেরও হতে পারে।

বুদ্ধিনাথের তিন ছেলে রামনাথ, টংকনাথ ও গৌরাঙ্গনাথ। এরমধ্যে রামনাথের অকাল মৃত্যু হয়, গৌরাঙ্গনাথ ছিলেন হাবা-গোবা, তবে টংকনাথ ছিলেন চতুর। বুদ্ধিনাথের মৃত্যু হলে টংকনাথ জমিদারির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।  

টংকনাথ তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের আস্থা অর্জন করার জন্য মালদুয়ার স্টেট গঠন করেন । পরে রাজা টংকনাথের স্ত্রী রাণী শংকরী দেবীর নামানুসারে মালদুয়ার স্টেটের নাম করণ করা হয় রাণীশংকৈল যার কারণে বর্তমানে উপজেলা ও উপজেলা সদরটি রাণীশংকৈল নামেই অভিহিত।  

রাজা টংকনাথ চৌধুরী খুব বড় মাপের জমিদার না হলেও তার আভিজাত্যের কমতি ছিল না। ১৯২৫ সালের ১৮ নভেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ গভর্নর হাউসে টংকনাথ চৌধুরীকে ব্রিটিশ সরকার চৌধুরী উপাধিতে ভূষিত করেন। কথিত আছে, টংকনাথের আমন্ত্রণে তৎকালীন বড়লাট এবং দিনাজপুরের মহারাজা গিরিজানাথ রায় রাণীশংকৈলে এলে আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দকে টাকার নোট পুড়িয়ে রীতিমতো রাজকীয় অভ্যর্থনা ও আপ্যায়ন করান এবং বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার উপহার দেন। এর ফলে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে চৌধুরী উপাধি এবং দিনাজপুরের মহারাজা গিরিজানাথ রায়ের কাছ থেকে রাজা উপাধি পান।

বর্তমান রাজবাড়িটির ভঙ্গুর অবস্থা হলেও এর নির্মাণশৈলী অতি নিপুন। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে রাজবাড়িটি নির্মিত হয়। রাজা টংকনাথের পিতা বুদ্ধিনাথের আমলেই রাজবাড়ি নির্মাণ কাজ শুরু হয় । বুদ্ধিনাথের মৃত্যুর পরে রাজা টংকনাথ রাজবাড়ির অসমাপ্ত কাজ শেষ করেন। প্রায় ১০ একর জমির উপর রাজবাড়িটি অবস্থিত । বিশাল এক সিংহ দরজা দিয়ে রাজবাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতে হয় । যদিও বর্তমানে সিংহ দরজার ছিটেফোঁটাও নেই। 

রাজবাড়ি সংলগ্ন উত্তর-পূর্ব কোণে কাছারি বাড়ির অবস্থান এবং পূর্বে রয়েছে দুইটি পুকুর

লাল রংয়ের দালানটি স্থাপত্যশৈলীতে আধুনিকতার পাশাপাশি ভিক্টোরিয়ান অলঙ্করণের ছাপ সুস্পষ্ট ।  

রাজবাড়িটির মূল ভবনটি দ্বিতল বিশিষ্ট। উপরে উঠার জন্য রয়েছে সিড়ি, যদিও বর্তমানে এই সিড়িটি এখন ভেংগে পরেছে। 

উপর নিচ, দুই তলা মিলিয়ে ভবনটিতে রয়েছে অসংখ্য কক্ষ। এই কক্ষগুলো জমিদারির বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে ব্যাবহৃত হত। তাছাড়া বিনোদনের জন্য ছিল রঙ্গমহল এবং ছিল সভাকক্ষ। 

রাজবাড়ির ভবনের পশ্চিমে একটি কূপ দৃশ্যমান। রাজবাড়ির পানির যোগানের জন্যই মূলত এই কূপটি ব্যাবহৃত হত।    

বর্তমানে রাজবাড়ি ও তৎসংলগ্ন সব স্থাপনা অবহেলিত ও পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে। 

রাজা টংকনাথ ১৯১১ সালে তৎকালীন বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার মধ্যে একমাত্র ব্যক্তি ছিলেন, যিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজে থেকে বি,এ পাশ করেন। তিনি দীর্ঘদিন বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। টানা ১৫ বছর তিনি জেলা বোর্ডের সদস্য ছিলেন ও প্রথম ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

রাজা টংকনাথ নিজ খরচে দুইটি দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করতেন। ৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত অনুদান দিতেন। রাজা টংকনাথ একটি ইংলিশ স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং ২০০ ছাত্রের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থাসহ স্কুলের উন্নয়নের সার্বিক দায়ভার গ্রহণ করেন। তার পিতা বুদ্ধিনাথ চৌধুরীর নামানুসারে প্রতিষ্ঠিত তৎকালীন B.N INSTITUTE  বর্তমানে যা রাণীশংকৈল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় নামে পরিচিত। 


তিনি শিক্ষানুরাগী হিসেবে শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই স্থাপন করেননি, তার লাইব্রেরীও ছিল বিভিন্ন বইয়ে সমৃদ্ধ। তার সংগৃহীত বিভিন্ন বই এখনও দিনাজপুর সরকারী কলেজ ও কারমাইকেল কলেজ লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত আছে ।

শিক্ষার পাশাপাশি হিন্দু ধর্মের প্রতিও ছিল রাজা টংকনাথের অগাধ অনুরাগ। রাজবাড়ি থেকে ২০০ মিটার দক্ষিণে হিন্দু ধর্মালম্বিদের জন্য তিনি নির্মান করেন  রামচন্দ্র বা জয়কালী মন্দির 

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারতবর্ষ ব্রিটিশদের শাসন থেকে মুক্ত হলে রাজা টংকনাথ চৌধুরী ১৭ আগস্ট স্বপরিবারে ভারতে চলে যান। তবে কথিত আছে রাজা মৌমাছির আক্রমণের শিকার হয়ে অসুস্থ অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যান এবং ১৯৪৮ সালে সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।

রাজা টংকনাথের তিন ছেলে  কর্মনাথ চৌধুরী, রুদ্রনাথ চৌধুরী এবং শেষনাথ চৌধুরী বর্তমানে ভারতেই অবস্থান করছেন।  


সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২০

উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ গণকবর, খুনিয়াদিঘী বধ্যভূমি

 

                                                  উত্তরবংগের সর্বৃহৎ গণকবর


ঠাকুরগাঁও জেলা সদর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে রানীশংকৈল উপজেলায় খুনিয়াদিঘি বধ্যভূমির অবস্থান। জেলা সদর থেকে দুই পথে খুনিয়াদিঘি বধ্যভূমিতে যাওয়া যায়। ঠাকুরগাঁও সদর থেকে বালিয়াডাংগী উপজেলা হয়ে অথবা আপনি ইচ্ছা করলে ঠাকুরগাঁও সদর থেকে পীরগঞ্জ উপজেলা হয়েও রানীশংকৈল উপজেলার খুনিয়াদিঘি বধ্যভূমিতে যেতে পারেন। এ যাত্রায় মোটরবাইক যোগে আমার ভ্রমণ সঙ্গী হয়েছে ভ্রমণ পিপাসু  আমার  তিন বন্ধু এন সি দাস, বিপু বিশ্বাস ও জুয়েল রানা মাসুদ।

উত্তরবংগের এই শান্ত নীরব জনপদ চিড়ে ঝকঝকে পিচঢালা পাকা রাস্তায় আপনি খুঁজে পাবেন উন্নয়নের প্রতিচ্ছবি। ফুরফুরে হিমেল বাতাসে আস্বাদিত হবেন স্বাধীণতার স্বাদে, যে স্বাধীণতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন এ দেশের লাখো শহীদ।  

রাস্তার দুই ধারের দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ফসলের মাঠ, কৃষকের কর্মযজ্ঞ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিমোহিত করবে আপনাকে। এ দৃশ্য দেখে নিশ্চয় আপনার মঞ্জুর হাসানের 'আমি প্রকৃতি হব' কবিতার দুটি লাইন আবৃতি করতে ইচ্ছে করবে-

'আমি পিপীলিকার মত অনন্তকাল হাঁটব
আমি উদাস কবির মত পথে প্রান্তরে ঘুরব
আমি প্রকৃতি হব'

রাণীশংকৈল উপজেলা সদরের শিবদিঘি মোড়ে পৌঁছালেই  চোখে পরবে একটি নামফলক । এই নাম ফলকে উপজেলার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ও অবস্থান লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। আছে প্রত্যেকটি স্থানের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসও।

নামফলক থেকে ১০০ মিটার পশ্চিমে গেলেই চোখে পরবে পুলিশ থানা কর্যালয়ের সাইনবোর্ড। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বর্তমান ঠাকুরগাঁও জেলার সীমান্তবর্তী হরিপুর,বালিয়াডাঙ্গী,রানীশংকৈল উপজেলা এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী এই থানা চত্তরে ক্যাম্প স্থাপন করেছিলপ্রতিদিন শত শত মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের লোকদের ধরে আনা হতো এই ক্যাম্পে।

থানা কার্যালয় থেকে সোজা দক্ষিণের রাস্তা বেয়ে এবারে আমাদের গন্তব্য খুনিয়াদিঘি বধ্যভূমিতে।

প্রায় ৩০০ মিটার রাস্তা অতিক্রম করলেই রাস্তার পশ্চিম পার্শ্বে পুকুর পাড়ে চোখে পরবে একটি চৌকঠ অবকাঠামো।

এই চৌকঠ অবকাঠামোর ভিতরে প্রবেশ করলে চোখে পরবে এই বধ্যভূমিতে শায়িত শহীদদের স্বরণে নির্মিত মূল স্মৃতিস্তম্ভটি।  

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে জাতীয় চার নেতার মধ্যে অন্যতম আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান এই স্মৃতিসৌধটি উদ্বোধন করেন।

এবার আসা যাক এই দিঘির নামকরণের ইতিহাস নিয়েপ্রচলিত আছে, প্রায় দুইশত বছর আগে স্থানীয় এক জমিদার ৬ একরের বিশাল এই দীঘিটি খনন করেন। এই এলাকার ব্যবসায়ীরা নির্জন ও জঙ্গলাকীর্ণ দীঘির পাশ দিয়েই ব্যবসা করতে যেতেন ভারতের রায়গঞ্জে। একবার কে বা কারা এক ব্যবসায়ীকে খুন করে দীঘির পাড়ে ফেলে রেখেছিল। তখন থেকে এই দীঘির নাম হয়ে যায় খুনিয়া দীঘি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার ক্যাম্পে সারাদিন নির্যাতনের পর ভোররাতে মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের লোকদের ধরে নিয়ে আসা হত এই পুকুরের পাড়ে। দীঘি পাড়ের শিমুল গাছে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতের তালুতে লোহার পেরেক মেরে ঝুলিয়ে রেখে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে এবং গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করতো। কখনো কখনো হত্যার পূর্বে লোকজনকে কবর খুঁড়তে বাধ্য করতো। হত্যার পরে দীঘি পাড়ের উঁচু জমিতে মাটি চাপা দিতো পাক হানাদাররা

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি আর্মি, রাজাকার,আলবদর আর আলশামসদের সহায়তায় ২০০০  থেকে ৩০০০  মানুষকে খুনিয়া দীঘিতে হত্যা করা হয়এর ফলে মানুষের রক্তে দীঘির পানির রং হয়ে যায় ঘন খয়েরি। রক্ত,লাশ,কঙ্কালে ভরপুর খুনিয়া দীঘি নামটি আরো সার্থক হয়ে উঠে।

শহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতিকে ধরে রাখতে পুকুরের দক্ষিণপাড়ে নির্মিত হয়েছে নতুন একটি স্মৃতিস্তম্ভ। স্মৃতিস্তম্ভের মূল ফটকের পাশেই নাম ফলকে সংযুক্ত করা হয়েছে কয়েকজন শহীদের নাম। নতুন প্রজন্মের কাছে এই সৌধ তুলে ধরছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসশহীদদের আত্মত্যাগ প্রেরণা জোগাচ্ছে এই প্রজন্মকে। 

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তে রাঙানো স্মৃতিসৌধটি খুনিয়া দিঘিতে ৭১এর জলন্ত প্রতীক হয়ে বাংলার স্বাধীনতা আজও বহন করছে।  দীর্ঘ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ আর লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম হয় স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের।

দেশ প্রেম বুকে নিয়ে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদদের প্রতি।  সেই সাথে সকল মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জানাই গভীর শ্রদ্ধা 




বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২০

জ্বীনের তৈরি মাত্র এক কাতারের গায়েবি মসজিদ!


এক কাতারের গায়েবি মসজিদ 

ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলার উত্তরে শান্ত-নীরব একটি গ্রামে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি অতি পুরাতন মসজিদ।
গ্রামের নাম মেদনী সাগর তাই মসজিদটি এখন মেদনী সাগর জামে মসজিদ নামেই অভিহিত।

তবে স্থানীয়দের কাছে এই মসজিদটির একটি ভিন্ন পরিচিতি আছে। স্থানীয়দের মাঝে এই মসজিদ নিয়ে  একটি বিশ্বাস প্রচলিত আছে যে, কোন এক সময় এক রাতেই হঠাৎ করে জ্বীনেরা এই মসজিদ নির্মান করেছিল। তাই মসজিদটিকে গায়েবি মসজিদও বলে থাকেন অনেকে। 



মসজিদটির একটি অন্যতম বৈশিষ্ট হচ্ছে এর কাতার ধারণ ক্ষমতা মাত্র একটি এবং এই এক কাতারে  প্রায় ৩০ জন মুসুল্লি একসাথে নামাজ আদায় করতে পারে।



তবে মসজিদটির নির্মাণে মোঘল আমলের স্থাপত্যশৈলী বিদ্যমান। ধারণা করা হয় মোঘল আমলে এই অঞ্চলে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে যেসব পীর -আউলিয়া এই বংগে এসেছিলেন তাদের মধ্যে কারো প্রচেষ্টায় এই মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল। মসজিদটি ছোট হলেও এর নিখুত নির্মান অত্যন্ত রুচিশীল ও সৌখিন।

বাইরের দিক থেকে মসজিদের দৈর্ঘ্য সাড়ে একত্রিশ ফুট এবং প্রস্থ চৌদ্দ ফুট ভিতরের দিকে এর দৈর্ঘ্য চবিবশ ফুট এবং প্রস্থ ছয় ফুট


কাতারের দুই পাশে রয়েছে দুটি জানালা।

যথারীতি মসজিদটিতে ইমামের জন্য রয়েছে মিম্বার ও মেহরাব। 

ভিতরে গোলাকৃতি গম্বুজগুলোর অবয়ব দৃশ্যমান। একটি গম্বুজ থেকে আরেকটি গম্বুজের মাঝের অংশগুলোতে রয়েছে বিশেষ বিম। 

রয়েছে আটটি কুলুঙ্গি তিনটি খিলান। তবে বর্তমানে ভিতরের দেওয়ালসহ এগুলো টাইলস দিয়ে আবৃত। 

তবে কাতার একটি হলেও মসজিদটিতে প্রবেশের জন্য দরজা আছে তিনটি। 

মসজিদটির উপরের অংশে রয়েছে তিনটি গম্বুজ ও পূর্ব-পশ্চিমে ৪টি করে  ৮ টি মিনার সদৃশ্য বুরুজ। গম্বুজ ৩টি ছাদ থেকে প্রায় ১০ ফুটউচ্চতা বিশিষ্ট। ভূমি থেকে প্রতিটি বুরুজের উচ্চতা ১০ফুট। 

সময়ের প্রয়োজনে মুসুল্লির ধারণ ক্ষমতা বাড়াতে মূল মসজিদকে সংযুক্ত করেই সম্প্রসারিত করা হয়েছে এখন মসজিদের সামনের অংশটি। 

যুগ যুগ ধরে এই ছোট মসজিদটিই উপমহাদেশে ইসলাম বিস্তারের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। হয়ত আরো শত শত প্রজন্মের কাছেও সাক্ষী হয়ে থাকবে। 

শুক্রবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২০

সীমান্তে কালীপূজা ও ভারত- বাংলাদেশ মিলনমেলা


ঠাকুরগাঁও জেলার সীমান্তঘেঁষা শান্ত জনপদ হরিপুর উপজেলা।  এই উপজেলার গোবিন্দপুর সীমান্তে প্রতি বছর জামরকালির পূজা উপলক্ষ্যে এক মেলা অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয়রা এই মেলাকে পাথরকালির মেলা হিসেবেই অভিহিত করেন। মেলার অন্যতম বৈশিষ্ট হচ্ছে মেলাপ্রাঙ্গণ সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার দুই পাশে দুই দেশের হাজার হাজার মানুষ মিলিত  হয়ে সীমান্তের মিলনমেলা ঘটায়।

x

সাধারণত কার্তিক মাসের আমাবষ্যা তিথীতে কালিপূজা হলেও এখানে মেলা বসে আগ্রহায়নে কৃষকেরা আমন ধান ঘরে তোলার পর।  মেলা প্রাঙণের আশেপাশে ধান ক্ষেতের ক্ষতি এড়াতেই এই সময়টায় মেলার আয়োজন করে আয়োজকরা।  

মেলাপ্রাঙ্গণ মুখরিত হয় নারী-পুরুষ ও শিশুদের সরগমে। শুধু স্থানীয়রা নয় বিভিন্ন বাহনযোগে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের আগমন ঘটে এখানে । 

মেলা মানেই হরেক রকম খাবারের সমাহার। মুখরোচক বিভিন্ন পদের আচার, গুড়ের জিলাপী ও বিভিন্ন মিষ্টির দোকানি পশরা সাজান এই মেলায়। এ ছাড়াও বিভিন্ন ফলফলাদি, বাড়ির প্রয়োজনীয় তৈজসপত্র ও কাপড়-চোপড়ের দোকানও বসে এই মেলায়। 

মেলায় বিনোদনের জন্য থাকে  শিশুদের নাগরদোলা। শামুক-ঝিনুকের কারুকার্যমন্ডিত মালা ও বিভিন্ন শো পিচও শোভা পায় এখানে।  থাকে নারী ও পুরুষের বিভিন্ন প্রসাধনী সামগ্রী। মেলায় থাকে বিভিন্ন বাদ্য যন্ত্র ও হরেক রকম বাঁশির দোকান। 

সমঅধিকারের এই যুগে পুরুষ বিক্রেতার পাশাপাশি মেলায় থাকে মহিলা বিক্রেতাও।

যেহেতু জামরকালির পূজাকে কেন্দ্র করে এই মেলা হিন্দু ধর্মালম্বের পূণ্যার্থীরা মেলার ফাঁকেই সেরে নেন পূজো। ঢাকি ও সানাই বাদকের এই সুর পূন্যার্থীদের পূজা অর্পনকে করে তুলে শুভ্র ও প্রানবন্ত।

পাঠা বলি কালিপুজার অন্যতম অনুষঙ্গ। মানতকারিরা কালির সামনে বলির জন্য নিয়ে আসেন পাঠা।

এই জামরকালি  পূজার সঠিক ইতিহাস  জানা না গেলেও ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের আগে থেকেই দুই দেশের স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায় এই কালির পূজা করে আসছেন। আগে এখানে পাথরের এক কালি মূর্তি ছিল তাই স্থানীয়রা এই মেলাকে পাথরকালির মেলা হিসেবেই অবিহিত করেন।  

মেলার পাশেই ছোট নদী কুলিক। মূলত এই নদীর পাড়েই মেলাপ্রাঙ্গণ। আর এই নদীই এখানে সীমান্ত হিসেবে ভারত ও বাংলাদেশকে বিভক্ত করেছে। দর্শনার্থীদের মূলত উদ্যেশ্য নদী পার হয়ে কাটাতারের বেড়ার পাশে যাওয়া। স্থানীয়রা এদিন দর্শনার্থীদের নদী পারাপারের জন্য বাঁশ বা কাঠ দিয়ে তৈরী করেন অস্থায়ী সাঁকো। স্থানীয় ভাষায় এই অস্থায়ী সাঁকোকে বলা হয় 'ধারা'। তবে সাঁকো দিয়ে পারাপারের জন্য দর্শনার্থীদের প্রতিজনে দিতে হয় দশ টাকা করে।  

নদী পার হলেই বিভাজনকারী সীমান্ত পিলার। সীমানা পিলার পার হয়ে প্রায় ২০০ মিটার নো ম্যান ল্যান্ডসের ভূমি পার হলেই পৌঁছানো যাবে কাটা তারের বেড়ার পাশে। অন্যদিন সীমান্তের এই জায়গায় প্রবেশ নিষেধ থাকলেও দুই দেশের সীমান্তবাহিনীর সমঝোতায় এই দিনে এই অবাঞ্চিত প্রবেশে নেই বাঁধা। 



কাঁটাতারের পাশে পৌঁছালেই সবাই হণ্যে হয়ে খুঁজে সীমান্তের ওপারের প্রিয় মুখটি। প্রিয়জনদের সাথে এই সাক্ষাত ও আবেগের কথোপকথন হয়ত টাকার অংকে অমূল্য। 

দুই ধারেই নামে অসংখ্য মানুষের ঢল। কেউ বা প্রিয়জনকে একটুখানি দেখার জন্য, কেউ বা আসে এই সীমান্তের মিলনমেলা দেখতে। শুধু বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নয় ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকেও হাজার হাজার মানুষ আসে রায়গঞ্জ জেলার এই বিন্দোল সীমান্তে। 



অনেকেই ডিজিটাল ডিভাইস বা ক্যামেরায়  প্রিয়জনের স্মৃতি ধারণ করে রাখেন এখানে। 


শুধু কথোপকথন বা আবেগের বিনিময় নয়, প্রিয়জনদের  সাথে বিনিময় হয় প্রিয়জনদের প্রিয় জিনিসিও।  তবে জিনিস বিনিময়ে কাঁটাতারের কারণে বিড়ম্বনাও কম নয়। 

ওপারের মানুষদের ইলিশ খুব প্রিয় তাই এপার থেকে ইলিশ বেচাকেনাও চলে হরদম। 

লাখো মানুষের পদচারনায় বছরের এই দিনটিতে সীমান্তের এই অঞ্চলটি হয়ে উঠে প্রানবন্ত। কেউ বা শিকড়ের খোঁজে কেউ বা পাসপোর্ট ভিসা ছাড়ায় প্রিয়জনদের একটুখানি দেখার জন্য। 

কাঁতা তারের এই বেড়াটি দুই দেশের ভূমিকে আলাদা করলেও আলাদা করতে পারেনি দুই দেশের মানুষের আবেগকে, দুই দেশের মানুষের সম্পর্ককে। 


দিনশেষে সবাইকে ফিরতে হয় আবার নিজ গন্তব্যে।প্রিয়জনদের সাথে মিলিয়ে থাকা এই আবেগ, এই অনূভুতি সীমান্তে মিলিয়ে যায় সীমানাহীনভাবে। 



শুক্রবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৯

পাখির খামারে বেকারত্ব দূর !



প্রথাগত হাস-মুরগির খামারের পাশাপাশি গড়ে উঠছে এখন পাখির খামার। দেশে যখন কর্মসংস্থানের অভাব তখন তরুণ উদ্যোমীরা বেছে নিচ্ছে এই ব্যাতিক্রমী পেশা। 

তেমনই একজন তুহিন পারভেজ সুজন। ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলার এই তরুণ স্বল্প পরিসরে গড়ে তুলেছেন  পাখির খামার। শখের বসে শুরু করলেও এটি এখন বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনা করেন তিনি। 



খামারে তিনি প্রতিপালন করছেন কোয়েল পাখি। কয়েল পাখি প্রচুর পরিমানে ডিম দিয়ে থাকে। তাছাড়াও এই পাখির ডিম ও মাংসের প্রচুর চাহিদা আছে বাজারে। বাংলাদেশ ও ভারতের আবহাওয়ায় এই পাখিটি ঝামেলাহীন ভাবেই প্রতিপালন করা যায়।

লাভ বার্ড। দেখতে সুন্দর এই পাখিটি মূলত অনেকেই শখের বসে পোষে থাকেন । তবে বাজারে লাভ বার্ডের প্রচুর দাম ও চাহিদা আছে। দেশি ও বিদেশি কয়েকটি প্রজাতির লাভ বার্ড প্রতিপালন করছেন তুহিন পারভেজ। বাংলাদেশ ও ভারতের আবহাওয়ায় এই পাখিটিও প্রতিপালন করা যায়।

ঘুঘু। দেশিয় এই পাখিটিও এখন খামারে প্রতিপালন হচ্ছে। প্রচুর পরিমানে ডিম ও মাংস উৎপাদনে যেমনি ঘুঘুর আছে অনেক সক্ষমতা তেমনি বাজারে এর চাহিদাও আছে প্রচুর। 

কবুতর। যদিও অনেকে এই পাখিটি শখের বসে প্রতিপালন করে থাকেন তবে এখন এটি বাণিজ্যিকভাবেও প্রতিপালন হচ্ছে। কবুতরের রয়েছে বিভিন্ন প্রকার দেশি ও বিদেশি জাত এবং এই পাখিটিও প্রচুর পরিমানে ডিম ও মাংস প্রদানে সক্ষম।

এসব পাখি প্রতিপালনের পাশাপাশি তুহিন পারভেজ করছেন টার্কি মুরগি, রাজহাঁস ও পাতিহাঁস  প্রতিপালন। 

শখের বসে করেন টিয়া ও খরগোশ প্রতিপালন। সবসময় আপন মমতায় আগলে রাখেন প্রাণীগুলোকে। 

এসব পাখি প্রতিপালনে পাখির বাসস্থান হিসেবে তুহিন পারভেজ ব্যাবহার করছেন  দেশিয় তারের তৈরী নেট, তারের খাঁচা, বাঁশ, মাটি ও কাঠের তৈরি বিভিন্ন উপকরণ। 

খাবার হিসেবে দেশিয় বাজারে প্রাপ্ত বিভিন্ন ধরণের ফিড খাওয়ান এসব পাখিদের। 

বেকারত্ব দূরীকরণে পাখির খামার হয়ে উঠতে পারে অন্যতম আয়ের উৎস। তবে খেয়াল রাখতে হবে এতে করে যেন জীববৈচিত্রের কোন প্রকার ক্ষতি না হয়। 















রবিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৯

মাওলানা ভাসানী, স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা!

মাওলানা ভাসানী
মাওলানা ভাসানী 
স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, হ্যা তিনিই ছিলেন প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা। গরীব মেহনতি ও নির্যাতিত মানুষের জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। 

মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের ধানগড়া পল্লীতে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা হাজী শারাফত আলী। হাজী শারাফত আলী ও বেগম শারাফত আলীর পরিবারে ৪ টি সন্তানের জন্ম হয়। একটি মেয়ে ও তিনটি ছেলে। মোঃ আব্দুল হামিদ খান সবার ছোট। তার ডাক নাম ছিল চেগা মিয়া। ছেলে-মেয়ে বেশ ছোট থাকা অবস্থায় হাজী শারাফত আলী মারা যান। কিছুদিন পর এক মহামারীতে বেগম শারাফত ও দুই ছেলে মারা যায়। বেঁচে থাকেন ছোট শিশু আব্দুল হামিদ খান।

পিতৃহীন হামিদ প্রথমে কিছুদিন চাচা ইব্রাহিমের আশ্রয়ে থাকেন। ওই সময় ইরাকের এক আলেম ও ধর্ম প্রচারক নাসির উদ্দীন বোগদাদী সিরাজগঞ্জে আসেন। হামিদ তার আশ্রয়ে কিছুদিন কাটান।

মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী যৌবনের শুরুতেই গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চিরদিনের জন্য গৃহত্যাগ করেন।

তিনি ছিলেন বিংশশতকী ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম তৃণমূল রাজনীতিবিদ ও গণআন্দোলনের নায়ক, যিনি জীবদ্দশায় ১৯৪৭-এ সৃষ্ট পাকিস্তান ও ১৯৭১-এ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

১৯২৯-এ আসামের ধুবড়ী জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের ভাসান চরে প্রথম কৃষক সম্মেলন আয়োজন করেন। এখান থেকে তার নাম রাখা হয় "ভাসানীর মাওলানা"।

তিনি সূফী এবং তাসাউফের সাধনা শেষে দেওবন্দ থেকে রবুবিয়াতের রাজনৈতিক দর্শনের শিক্ষা নিয়ে ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট গঠনকারী প্রধান নেতাদের মধ্যে তিনি অন্যতম।

তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী নেতা এবং পঞ্চাশের দশকেই নিশ্চিত হয়েছিলেন যে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ একটি অচল রাষ্ট্রকাঠামো। ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দের কাগমারী সম্মেলনে তিনি পাকিস্তানের পশ্চিমা শাসকদের 'ওয়ালাকুমুসসালাম' বলে সর্বপ্রথম পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতার ঐতিহাসিক ঘণ্টা বাজিয়েছিলেন।

অথচ আওয়ামী লীগের এই প্রতিষ্ঠাতা সভাপতিকে স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন গৃহবন্দি করে রাখা হয়। ১৯৭২ সালের ৯ই এপ্রিল ঢাকার পল্টন ময়দানে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জনসভায় তিনি ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক দেন। ভারতীয় আগ্রাসন ও আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক দেন। দেশব্যাপী দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে ১৯৭৪ সালে ভাসানীর ভুখা মিছিল বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে।

১৯৭৬ সালে ফারাক্কা অভিমুখে ঐতিহাসিক লংমার্চের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি ভারতের সেবাদাসদের চক্ষুশূলে পরিনত হন। আর একারনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা হয়েও আওয়ামী লীগের কাছ থেকে প্রাপ্য সম্মানটুকু পাননি। আওয়ামী লীগের কাছে তিনি কেবলই আজ এক বিস্মৃতির নাম।

১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ নভেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই দেশ বরেণ্য নেতা মৃত্যুবরণ করেন। তাকে টাংগাইল জেলার সদর উপজেলার উত্তর-পশ্চিমে সন্তোষ নামক স্থানে পীর শাহজামান দীঘির পাশে সমাধিস্থ করা হয়। সারা দেশ থেকে আগত হাজার হাজার মানুষ তার জানাযায় অংশগ্রহণ করে।

রবিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

ব্যাঙ কেন সাপ খায়?

                                                               ব্যাঙ যখন সাপ খায় 

প্রকৃতি , পরিবেশ ও প্রাণীবৈচিত্র একটি বাস্তুসংস্থানের নিয়ম দ্বারা পরিচালিত। প্রাণীকূলের খাদ্যাভাসও এই বাস্তুসংস্থানের নিয়ম দ্বারা পরিচালিত হয়। প্রাণীজগতে অপেক্ষাকৃত ছোট প্রাণীরা হচ্ছে বড় প্রাণীগুলোর খাবার। যেমন  লতাপাতা হরিণের খাবার আবার হরিণ বাঘের খাবার। এভাবেই একটি রিসাইকেল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পৃথিবী ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা হয়ে আসছে। 

কিন্তু মানব কতৃক পরিবেশ দুষণ ও বনাঞ্চল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে প্রকৃতির ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে দেখা দিচ্ছে খাদ্যাভাবের। বিরুপ আকার ধারণ করছে প্রকৃতি। 

প্রকৃতির বিরুপ প্রতিক্রিয়ার কারণে দেখা দিচ্ছে খাদ্যাভাবের, আর এই খাদ্যাভাবের কারণে প্রাণীকূলে দেখা দিচ্ছে খাদ্যাভাসের অদ্ভুত পরিবর্তন। জীববিজ্ঞানীরা এই রকম বিপরীত খাদ্যাভ্যাসকে পৃথিবীর প্রকৃতি ও মানবজাতির জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন!

ব্যাঙ হচ্ছে সাপের খাবার কিন্তু দেখা যাচ্ছে ঘটছে উল্টো ! খোদ সাপেই পরিণিত হচ্ছে ব্যাঙের খাবারে।

সাপুড়ে তোঁতা মিয়ার মৃত্যুর আগে সাপ ছোবল দেওয়ার দৃশ্য

                                             তোঁতা মিয়াকে সাপ ছোবল দেওয়ার দৃশ্য


সাপুড়ে তোঁতা মিয়ার বাড়ি ছিল ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলার চৌরঙ্গী বাজারে। বাংলাদেশে তিনিই প্রথম সাপের খামার করেছিলেন। বিভিন্ন ধরণের সাপের সংগ্রহ ছিল তার কাছে। প্রাকৃতিকভাবে সাপের প্রজনন ঘটিয়ে সাপের বাচ্চা উৎপাদন করতেন। সেই সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়া ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় বেশ কয়েকবার শিরোণাম হয়েছিল তার এই সাপের খামারের খবর। খামারটি এক পলক দেখার জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক মানুষ ছুটে আসতেন। দেশের বাইরে থেকেও আসতেন অনেক পর্যটক। তার এই সাপের খামারটি হয়েছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের গবেষণার বিষয়বস্তু।

২০০৭ সালে তারই পালিত এক সাপ ছোবল দিলে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বিষক্রিয়া নিষ্ক্রিয় না হওয়ায় দুদিন পর তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পরেন।

তার মৃত্যুর পর সাপ সহ কয়েক হাজার সাপের বাচ্চা মারা যায়, কিছু সাপ ঢাকা চিড়িয়াখানায় স্থানান্তরিত করা হয় ও কিছু সাপ চট্টগ্রাম ভার্সিটির প্রাণীবিদ্যা বিভাগ নিয়ে যায়।

সোমবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

বাঁশের বাঁশির ইতিহাস ও আদ্যোপান্ত

                                                                        বাঁশের বাঁশি 


বাঁশি এক ধরনের সুষির অর্থাৎ ফুৎকার (ফুঁ) দিয়ে বাজানো যায় এমন বাদ্যযন্ত্র । বাংলায় বাঁশিকে মুরালি, মোহন বাঁশি, বংশী অথবা বাঁশরিও বলা হয় । বাঁশির পাশ্চাত্য সংস্করনের নাম ফ্লুট (flute) 

অ্যাড্রাল পাওয়েলের মত অনুসারে, অনেক প্রাচীন সংস্কৃতিতে বাঁশির মতো সরল যন্ত্রের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। লোকমত এবং পুরাতত্ত্বের দিক থেকে বিচার করলে বাঁশির তিনটি জন্মস্থান চিহ্নিত করা যায়: মিশর, গ্রিস ও ভারত। আড়াআড়ি বাঁশি এই তিনটে জায়গাতেই পাওয়া গেলেও পাশাপাশি বাজানোর (অনুদৈর্ঘ্য) বাঁশি একমাত্র প্রাচীন ভারতেরই অবদান। পাওয়েলের ধারণা, মধ্যযুগের পর থেকে ভারতীয় বাঁশির গঠনে তেমন কোনো বিবর্তন হয়নি। তাছাড়া ভারতীয় বাঁশি থেকে সামান্য আলাদা নকশার বাঁশি দেখা যায় চীনে, সেই ভিত্তিতে বলাই যায়, প্রথম বাঁশির জন্ম ভারতেও হয়নি, চীনেও হয়নি। সম্ভবত এর জন্ম হয়েছিল আরো অনেক আগে, মধ্য এশিয়ায়।

মধ্যযুগের ভারতীয় বাঁশি অন্যান্য সংস্কৃতিতে বেশ প্রভাব বিস্তার করেছিল। মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় শিল্পকলায় বাঁশির প্রভাব এতটা বেড়েছিল যে, লুসার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের ছাত্র লিয়েন এলিচের মত ছিল, বাঁশি ১০ম শতাব্দীতে ভারত থেকে বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্যে পৌঁছায় এবং ভারতের মতোই ইউরোপেও জনপ্রিয়তা লাভ করে।
সংগীত-ইতিহাসবিদ ব্রুনো লক্ষ করেছেন, ভারতের সমস্ত প্রাচীন পুরাতাত্ত্বিক ভাস্কর্য ও চিত্রকলায় বাঁশিকে অনুভূমিকভাবে (একটু নিচু করে) বাজানোর রীতি পাওয়া যায়। সঙ্গে এটাও লক্ষণীয় যে, সেকালে বাদ্যযন্ত্র বাজানোতে কোনো লিঙ্গভেদ ছিল না নিদর্শনগুলোতে প্রচুর নারীশিল্পীর ছবিও পাওয়া গেছে। কিন্তু পঞ্চদশ শতাব্দী শুরু হতেই বাঁশি বাজানোর অধিকার ক্রমে ক্রমে পুরুষদের দখলে চলে যায় আর বাজানোতে আড়াআড়ি পদ্ধতির শুরু হয়। সম্ভবত ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের আগমন ও হিন্দুস্তানি সংগীতের উপর পশ্চিম এশীয় প্রভাব এই পরিবর্তনের জন্য দায়ী ব্রুনো ব্যাখ্যা করেছেন।

শিল্প ও সংগীত বিষয়ক সংস্কৃত গ্রন্থ নাট্যশাস্ত্রে (~২০০ খ্রিঃপূঃ থেকে ২০০ খ্রিস্টাব্দ) উল্লিখিত হয়েছে, বাঁশি সে সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ বাদ্যযন্ত্র ছিল। অনেক হিন্দুগ্রন্থে বাঁশি বা বেণুকে সংগীতকলায় ব্যবহার করার জন্য মানুষের গলার স্বর ও বীণার পরিপূরক হিসেবে দেখানো হয়েছে (বাণী-বীণা-বেণু)। ঋগ্বেদের(১৫০০-১২০০ খ্রিঃপূঃ) মতো প্রাক্‌বৈদিক ও বৈদিক গ্রন্থে একে নাদী আর তূণব এবং পরবর্তী বৈদিক যুগের হিন্দু গ্রন্থে বাঁশিকে বেণু বলা হয়েছে। উপনিষদ যোগেও এর উল্লেখ আছে।

বংশী জাতীয় যন্ত্রকে অনেক প্রাচীন হিন্দু[, বৌদ্ধ ও জৈন মন্দিরের চিত্র ও ভাস্কর্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। হিন্দু দেবতা কৃষ্ণের চিত্রায়ণে বাঁশি একটি অপরিহার্য অঙ্গ। কৃষ্ণ  রাধার প্রেম কাহিনির সাথে বাঁশি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বংশী কৃষ্ণের পবিত্র অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী বাদ্যযন্ত্র হিসেবেও খ্যাত। 

বাঁশি তৈরিতে লাগে বিশেষ ধরনের মুলিবাঁশ।বাঁশটির পুরুত্ত পাতলা হলে সুন্দর মিষ্টি আর নিখুত সুর আসবে। বাঁশ রোদে শুকিয়ে বাঁশি অনুসারে মাপমতো কেটে টুকরো করা হয়। এরপর টুকরোগুলো মসৃণ করে নিতে হয়। পরে কয়লার আগুনে পোড়ানো লোহার শলাকা দিয়ে ছিদ্র করা হয়। আঁকা হয় নকশা। এরপর মাটির প্রলেপ লাগিয়ে আবার আগুনে সেঁকে জলেতে ধুয়ে বাঁশিগুলো পুনরায় রোদে শুকানো হয়। শুকানোর পর বার্নিশ করা হয়। এরপর বাঁশিতে ফুঁ—সুর উঠল কিনা। 

তবে বর্তমানে আধুনিক উপায়ে হাতির দাঁত, ফাইবার গ্লাস আর নানা ধাতু দিয়েও বাঁশি তৈরি করা হচ্ছে।  বাঁশির দৈর্ঘ্য সাধারণত ৩০ সেন্টিমিটার (১২ ইঞ্চি) থেকে ৭৫ সেন্টিমিটারের (৩০ ইঞ্চি) মধ্যে হয়, আর এর পরিধি হয় মানুষের বুড়ো আঙুলের সমান।

বাঁশি সাধারণত তিন প্রকারের হয়ে থাকেঃ
  1. সরল বাঁশি
  2. আড় বাঁশি
  3. টিপরাই বাঁশি

বাঁশি নানান রকম স্কেলের হয়। যেমন ছয়, সাড়ে ছয়,সাত, সাড়ে সাত, আট, সাড়ে আট, নয়, সাড়ে নয়, এগারো, সাড়ে এগারো ইত্যাদি। এই স্কেল গোল বাঁশির বাঁশের দৈর্ঘ্য, ব্যাস, ছিদ্রের অবস্থান প্রভৃতির উপর নির্ভর করে ।
বাঁশির নম্বর
বাঁশির স্কেল
৮ ১/২ (সাড়ে আট)
C# (সি শার্প)
C ( সি )
B ( বি )
৬ ১/২ (সাড়ে ছয়)
A# (এ শার্প)
A ( এ )
৫ ১/২ (সাড়ে পাঁচ)
G# (জি শার্প)
G ( জি )


বাঁশিতে সংগীতের সাতটি স্বর (সা রে গা মা পা ধা নি) এবং পাঁচটি বিকৃত স্বর ( ঋ জ্ঞ ক্ষ দ ণ), সর্বমোট ১২ টি স্বরই পাওয়া যায় ।

বাঁশিতে সুর পরিবর্তন (টিউনিং) করা যায় না, তাই একজন বংশীবাদক কে ১২ টি স্কেলের ১২টি বাঁশিই সাথে রাখতে হয়।


বাঁশিতে
  • -উদারা সপ্তক এর পা ধা নি
  • -মুদারা সপ্তক এর সবগুলো স্বর
  • -তারা সপ্তক এর সা রা গা মা পা পাওয়া যায়
পা্‌ ধা্‌ নি্‌ সা রে গা মা পা ধা নি র্সা র্রে র্গা র্মা র্পা